২০ জুলাই, ২০২৪, শনিবার

কলঙ্কিত পুরুষ হতে চাননা শেফ সল্ট বে

Advertisement

তুরস্কের ইস্তাম্বুলের এক কসাইখানায় শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ১৪ বছর বয়সে। তিনি আজ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ধনী বাবুর্চিদের একজন; পরিশ্রম একাগ্রতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারলে যে সবই করা সম্ভব তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ইস্তানবুলের নুসরেত গোকচে। সারা বিশ্বে তিনি বিখ্যাত ‘সল্ট বে’ নামে।

তুরস্কের আনাতোলিয়ার ইরজুরেমের এক অসচ্ছ্বল কুর্দি পরিবারে জন্ম নুসরেত গোকচেকের। বাবা খনিশ্রমিক থাকায় সবসময় অভাব লেগেই থাকতো। তাইতো পড়াশোনা না করে নুসরেত লেগে পড়েছিলেন কসাইখানায় কাজে। সে কাজটা ভালোই রপ্ত করেছিলো নুসরেত।

ভ্রমনেও তার আগ্রহ ছিলো বেশ, তাই কিছু টাকা জমিয়ে ২০০৭-১০ সালের দিকে আর্জেন্টিনা আর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেন। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো বিনা পরিশ্রমিকে সেখানে গিয়ে কাজ করেছিলেন বিভিন্ন রেস্তরায়। মাংস কাটা আর তা রান্নার নানা প্রণালি জানাও হয়েগিয়েছিলো তার। ২০১০ সালে দেশে ফিরে ইস্তাম্বুলে খুলে ফেলেন নিজের রেস্তোরাঁ। সল্ট বে। ২০১৪ সালে শাখা করেন দুবাইয়ে।

২০১৭ সালের জানুয়ারিমাসের ৭ তারিখে ‘অটোমান স্টে’ শিরোনামে ৩৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার পরেই বিশ্বব্যপি নজর কাড়েন সল্ট বে নামে বিখ্যাত নুসরেত গোকচে। নিজস্ব শৈলীতে মাংস কেটে ও গোখরা সাপের ভঙ্গিমায় মাংসের ওপর লবণ ছিটানোর ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে এক কোটি ভিউ হয়ে যায়। রাতারাতি ইন্টারনেট তারকা বনে যান নুসরেত।

সল্ট বের আরও একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেটা দেখা হয় ৪০ লাখ বার দেখেছে মানুষ। ইনস্টাগ্রামের চার কোটি ফলোয়ারই তাকে এনে দিয়েছে এত জনপ্রিয়তা। আর এর ফলেই বেড়ে চলেছে তাঁর রেস্তোরাঁর সংখ্যা। আবুধাবি ও দুবাইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে দোহা, আঙ্কারা, বদ্রুম, ইস্তাম্বুল, মারমারিস, জেদ্দা, গ্রিসের মিকোনাস এবং মিয়ামি, ক্যালিফোর্নিয়া, ডালাস, বেভারলি হিলস, নিউইয়র্ক ও লন্ডনে নুসরেতের স্টেকহাউস চেইন নুসার–এট শাখা ছড়িয়েছে।

ম্যারাডোনা, মেসি, নেইমার, বেকহাম থেকে শুরু করে অস্কারজয়ী হলিউড তারকা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওরা তাঁর রেস্তোরাঁর নিয়মিত অতিথি নুসরেতের রেঁসতোরায়। এসব সুপারস্টারদের বিশেষ ভঙ্গিমায় আপ্যায়ন করেন সল্ট বে নিজেই। ব্রিটিশ ফুটবলার ড্যানি ওয়েলবেক একটি গোল দেওয়ার মুহূর্ত উদযাপন করেন সল্ট বের লবণ ছিটানোর ভঙ্গিমায়। এমনকি বেন অ্যাফ্লেক ও বিশ্বনন্দিত গায়িকা রিহানাকে সল্ট বের প্রতিকৃতি মুদ্রিত টি-শার্ট পরতে দেখা যায়। আরঅ্যান্ডবি স্টার বিয়ন্সে, সল্ট বেকে তাঁর বাসায় এক পার্টিতে বাবুর্চি হিসেবে আমন্ত্রণ জানান। এ জন্য তিনি পারিশ্রমিক হিসেবে নেন ২০ হাজার মার্কিন ডলার।

হলিউডসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের নন্দিত তারকারা তাঁর সামনে বসে লবণ ছিটানোর দৃশ্য দেখেছেন এবং মুগ্ধ হয়েছেন। খাবারের অত্যধিক দাম হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র সল্ট বের বিশেষ ভঙ্গিমা সচক্ষে দেখতে তাঁর রেস্তোরায় খেতে যান। একবার একজন নুসার-এট মিয়ামিতে এক বেলা খাবারের একটি বিল তাঁর টুইটারে পোস্ট করেন, যার পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ২২৮ দশমিক শূন্য ৫ মার্কিন ডলার।

খ্যাতির অনেক বিড়ম্বনাও বয়ে এনেছে সল্ট বের জীবনে। ২০১৯ সালে চারজন সাবেক কর্মী মামলা ঠুকে দেন তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগ, তিনি নাকি তাঁদের বকশিশে ভাগ বসাতেন। মামলার নিষ্পত্তি করতে সল্ট বেকে গুনতে হয়ে ২ লাখ ৩০ হাজার ডলার। তিনি অবশ্য তা অস্বীকার করে বলেন, চাকরিচ্যুত হওয়ার কারণে তাঁরা এমন অভিযোগ করেছেন বলে অভিযোগ করেন নুসরেত।

এর রেশ কাটতে না কাটতেই কাল হয়ে দাঁড়ায় আরেক পোস্ট। একটি কারখানার খামারে ঠাসাঠাসিভাবে আবদ্ধ অনেকগুলো মহিষের সঙ্গে তাঁর একটি ছবি পোস্ট করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বেশ কিছু তুর্কি সেলিব্রেটি এবং সাংবাদিকসহ অনেকেই এর প্রতিবাদ জানান।

সল্ট বের ‘স্টেক উইথ গোল্ড ডাস্ট’ আবা্রও বিতর্ক ছড়ায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। তাঁর নতুন রেসিপি, ‘টোয়েন্টি ফোর ক্যারেট গোল্ড স্টেক’ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি স্বর্ণচূর্ণ দিয়ে সাজানো স্টেক ডিশ তৈরি করছেন।

২ ঘণ্টারও কম সময়ে ৪ দশমিক ৪ মিলিয়নেরও বেশিবার দেখা হয়ে যায় ভিডিওটি। হাজার হাজার ফলোয়ার সেখানে নেতিবাচক মন্তব্য করেন। অনেকে সল্ট বের মাংসের ওপর ছুরি চালানো ও লবণ ছিটানোর ভঙ্গিমাকে অতিরঞ্জিত ও লোকদেখানো বলে মন্তব্য করেন। এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এটা দেখানোর জন্য করি না, এটা আমার সিগনেচার স্টাইল,। চিত্রাঙ্কনের মতো এটি হলো মাংসের চূড়ান্ত স্পর্শ; আমি মাংসকে সম্মান প্রদর্শন করি।’ সল্ট বে আরও বলেছেন যে তিনি কোনো বিদেশি ভাষা জানেন না, তবে তিনি মাংসের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

জনপ্রিয়তা কিংবা বিতর্কের বাইরে সল্ট বে ব্যক্তিগত জীবনে একজন চমৎকার মানুষ। তুর্কি গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, এরজুরুমের প্যালালি গ্রামে তিনি প্রায় এক মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে চার হাজার বর্গমিটার আয়তনবিশিষ্ট মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন। এ ছাড়া তিনি নিজ শহরে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

২০২০ সালের ৪ আগস্ট বৈরুতের অগ্নিকাণ্ডে হতাহত ব্যক্তিদের জন্য তিনি তাঁর ইস্তাম্বুল শাখার এক দিনের আয়ের সব অর্থ দান করেন। তিনি ২৪ ঘণ্টার ১৮ ঘণ্টাই কাজ করে কাটান। এমনকি তিনি ছুটির দিনেও কাজ করেন। সব সময় নিজেকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করেন। তবে এত কাজের মধ্যে থেকেও তিনি তাঁর পরিবারকে সময় দেন ঠিকই। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যে পুরুষ তার পরিবারকে সময় দিতে পারে না, সে পুরুষ নামের কলঙ্ক।’

Advertisement

আরও পড়ুন

Advertisementspot_img
Advertisement

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে পাশে থাকুন

Advertisement