২৪ জুলাই, ২০২৪, বুধবার

তালেবানের নেতা কে এই মোল্লাহ বারাদার?

Advertisement

পুরো নাম মোল্লাহ আব্দুল গনি বারাদার। তবে দুর্ধর্ষ জঙ্গি গোষ্ঠী তালেবানের কাছে তিনি পরিচিত ‘মোল্লা বারাদার আখুন্দ’ নামে। পার্সি শব্দ বারাদার যা ইংরেজিতে ব্রাদার। যার অর্থ ভ্রাতা। আখুন্দ শব্দটিও পার্সি। আখুন্দ পার্সি ভাষায় সাধারণত পণ্ডিতদের কথাই বোঝানো হয়।

মোল্লাহ আব্দুল গনি বারাদারের পাণ্ডিত্য বা শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনও সরকারি প্রশংসাপত্র পাওয়া যায় না। তবে তার কৌশলের দক্ষতা ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় স্বীকৃত। অনেক বলে থাকেন, খোদ যুক্তরাষ্ট্রকে এই মোল্লাহ বারাদারই বোকা বানিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য বারাদারের পেছনে রয়েছে আরেক বড় শক্তি চীন। অস্ত্র, রসদ, অর্থ সব কিছুই যুগিয়ে যাচ্ছে চীন। মাত্র কিছুদিন আগে বারাদারকে ডেকে রাজকীয় মেহমানদারিও করেছে পৃথিবী শাসনের স্বপ্ন দেখা উঠতি পরাশক্তি চীন।বারাদার চীন

মোল্লাহ বারাদারের পরিচয় তিনি তালেবানের রাজনৈতিক প্রধান। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অনুমান সত্যি হলে বারাদারই হবেন পরবর্তী আফগান প্রেসিডেন্ট। আর যদি তাই হয় তাহলে এই প্রথমবারের মতো কোনো শীর্ষ পদে বসবেন এই তালেবান কমান্ডার। দুর্ধর্ষ এবং কূটবুদ্ধিসম্পন্ন মোল্লাহ বারাদারের জীবনী নিয়ে লিখেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো।

বারাদার তালেবান প্রধান নন। কখনো ছিলেন না। সেই পদে আপাতত রয়েছেন হাইবাতুল্লা আখুন্দজাদা। বরাবর দ্বিতীয় স্থানে কাজ করা বারাদারের ভূমিকা ছিল তালেবান কৌশলীর। আড়ালে থেকে প্রধানের মস্তিষ্ক হয়ে কাজ করেছেন। বহু বছর সেভাবে সামনে আসেননি।

তবে প্রধান না হয়েও তালেবানের রাজনৈতিক অবস্থানগত কৌশল কিংবা অভিমুখ তিনিই ঠিক করে দিয়েছেন। দেশে তো বটেই এমনকি আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তার অবস্থানই ছিল তালেবানের শেষ কথা। এ কারণেই তালেবানের প্রধান না হয়েও প্রধান মুখ তিনি।

২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন তার সঙ্গে কথা বলে তালেবানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করেছিল। তার আশ্বাসে আফগানিস্তান থেকে সেনা সরিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি পাকিস্তানের জেলে বন্দি বারাদারকে মুক্ত করার নির্দেশও দিয়েছিলেন সাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

রোববার রাতে তালেবান যোদ্ধারা আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভবনের দখল নেওয়ার পর সেই বারাদরই বলেছেন, ‘এই তো সবে শুরু। তালেবানকে আসল পরীক্ষা এবার দিতে হবে। দেশের মানুষকে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হবে তালেবানকে।’

মোল্লাহ আব্দল গনি বারাদরের জন্ম ১৯৬৮ সালে কান্দাহার প্রদেশে। জন্মসূত্রে এই তালেবান নেতা একজন দুররানি পশতুন। দুররানিরা আফগানিস্তানের আদি গোষ্ঠী। তাদেরই পূর্বপুরুষ আহমেদ শাহ দুররানি আধুনিক আফগানিস্তানের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।তালেবান বারাদার

নামের সঙ্গে ‘পণ্ডিত’ থাকলেও তার শিক্ষা সংক্রান্ত কোনো তথ্য কোথাও নেই। তবে দেশের হয়ে তিনি যুদ্ধ করছেন কিশোর বয়স থেকে। আশির দশকে সোভিয়েতের নিয়ন্ত্রণে চলা আফগান শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। তখন আফগান মুজাহিদিনের সদস্য হয়েছিলেন।

বেরাদরের সহযোদ্ধা ছিলেন তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ ওমর। ১৯৯২ সালে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয় আফগানিস্তান। প্রেসিডেন্ট হয়ে বারাদর যে দেশের নেতৃত্ব দেবেন, তার নাম হবে ইসলামিক এমিরেটস অব আফগানিস্তান।

বারাদার এই দেশের স্বপ্ন দেখছেন সেই ১৯৯২ সাল থেকে। আফগানিস্তানকে আমিরাত বানানোর লক্ষ্যে সেই সময়েই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি মাদ্রাসা। যার উদ্দেশ্য ছিল, আফগানিস্তানের ধর্মীয় শুদ্ধিকরণ করে তাকে প্রকৃত ইসলামি আমিরাত হিসেবে গড়ে তোলা।

মোহাম্মদ ওমর তখন ধর্মীয় নেতা। শোনা যায়, বারাদরের ভায়রা ভাই তিনি। ওমর এবং বারাদরের উদ্যোগেই তৈরি হয় মাদ্রাসাটি। নাম দেওয়া হয় ‘তালিবান’। তালেবানের যাত্রা তখন থেকেই শুরু। আর এর ঠিক পাঁচ বছরের মাথাতেই সাফল্য আসে তালেবানদের।

১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানের দখল নেয় তালেবান। রোববার রাতে তালেবান যেভাবে কাবুল দখল করেছে ঠিক সেভাবে আফগানিস্তানে শুরু হয় তালেবানি শাসন। সেই রাষ্ট্রেও প্রধান ছিলেন ওমর। বারাদর দায়িত্ব নেন আফগান সেনাদের। সেই পদ বহু বার বদলেছে।

২০০১ সালে মার্কিন সেনারা যখন আফগানিস্তান থেকে তালেবানকে উৎখাত করে, তখন বেরাদর ছিলেন আফগানিস্তানের উপ-প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়ে সেখানেই তালেবানের প্রশাসনিক সংগঠন ‘কোয়েত্তা সুরা’ গঠন করেন।

তারপর বহুবার তালেবানের হয়ে বার্তা নিয়ে আফগান প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের সঙ্গে আলোচনা অনেকটা এগিয়েছিল। এক সময়ে তাকেকে তালেবানের ‘শান্তির মুখ’ হিবেবে দেখতে শুরু করেছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

কিন্তু ২০১০ সালে আচমকাই বারাদরকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান। আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ তখন বলেছিল এই গ্রেফতারির নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশ রয়েছে। এ বিষয়ে জানের তাদের মতে, পরে যুক্তরাষ্ট্রই ইসলামাবাদকে বারাদরকে মুক্তি দিতে বলে।

সদ্য সাবেক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আফগানিস্তান এবং পাকিস্তান সংক্রান্ত উপদেষ্টা জালমায় খালিজাদ বারাদরের সঙ্গে দেখা করেন। মুক্তি পেয়ে তখন কাতারের রাজধানী দোহায় রয়েছেন বারাদর। সেখানেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানের শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হয়।

এই চুক্তিতে তালেবানদের ক্ষমতা সংক্রান্ত সমঝোতায় আসার সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সঙ্গে আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো বাহিনীকে সরিয়ে নেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের তরফে। সেনা প্রত্যাহারের এই সময়সীমা ছিল আগামী ৩১ আগস্ট।

তখন অনেকেই এই চুক্তি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ এই পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। তারা অবশ্য গতকাল রোববার তালেবানের কাবুল দখল ও আফগান সরকার পতনের পর বলছেন, বারাদর আসলে ওই চুক্তি করেছিলেন সময়ক্ষেপণের জন্য।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র যতদিনে আফগানিস্তান থেকে তাদের সেনা সরিয়েছে ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি নিয়েছে তালেবান। কারণ সেনা সরলেই আক্রমণ করবে বলে। আসলে কৌশলী মোল্লাহ বারাদর বরাবরই ধৈর্যশীল। কারণ, তিনি এটা জানেন সবুরেই মেওয়া ফলে।

Advertisement

আরও পড়ুন

Advertisementspot_img
Advertisement

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে পাশে থাকুন

Advertisement