১৯ জুলাই, ২০২৪, শুক্রবার

বিশ্ব মশা দিবস আজ: করোনার সঙ্গে ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ ছড়াচ্ছে সারাদেশে

Advertisement

আজ বিশ্ব মশা দিবস। দেশে করোনা মহামারি পরিস্থিতির মধ্যেই এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে শত শত লোক হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মশা দিবসের গুরুত্ব থাকলেও মশাবাহিত বিভিন্ন রোগের উর্বর ভূমি বাংলাদেশে একপ্রকার অবহেলিত মশা দিবস। গবেষকরা বলছেন, প্রতি বছর বাংলাদেশে লক্ষাধিক মানুষ মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। আর এতে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন বহু মানুষ।

আগে ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার মতো রোগ শুধু রাজধানী ঢাকায় মহামারি পর্যায়ে ছড়ালেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে গত দু-তিন বছর ধরে। কারন ডেঙ্গু এখন মিলছে জেলা শহরে এমনকি গ্রামেও। গতকাল বৃহস্পতিবারও সরকারি হিসেবে কুমিল্লাতে ৩জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন- যা বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে প্রাণঘাতী করোনার সঙ্গে ডেঙ্গু মিলে ভয়ংকর এক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

জানা যায়, ১৯৩০ সাল থেকে প্রতি বছর ২০ আগস্ট দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হচ্ছে। ব্রিটিশ চিকিত্সক রোনাল্ড রস ১৮৯৭ সালের ২০ আগস্ট ম্যালেরিয়া রোগের কারণ যে, মশা সেটি আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কারের জন্য তিনি পরে চিকিত্সাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান। তার সম্মানে যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন দিবসটি পালন শুরু করে। এর পর থেকে পৃথিবীর অনেক দেশেই এই দিবস পালিত হয়ে আসছে। এ বছর মশা দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘ম্যালেরিয়া শূন্য লক্ষ্য অর্জন’।

উষ্ণ-আর্দ্র আবহাওয়া, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা ও মানুষের অসচেতনতার কারণে বাংলাদেশ মশার প্রজননের উপযুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১২৩ প্রজাতির মশা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমান ঢাকায় রয়েছে ১৪ প্রজাতির মশা। মশা নিয়ন্ত্রণ ও মশাবাহিত রোগের চিকিত্সায় ব্যয় হচ্ছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে মশাবাহিত রোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া ও জাপানিজ এনকেফালাইটিস।

২০০০ সালে প্রথম বাংলাদেশে ডেঙ্গু শনাক্ত হয় এবং পাঁচ হাজার ৫০০ মানুষ আক্রান্ত হয়। এরপর প্রতি বছরই কমবেশি ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব হয়েছে, তবে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ২০১৯ সালে। ঐ বছর সরকারি হিসাব অনুযায়ী ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় এবং ১৭৯ জন মারা যায়। আর ২০২১ সালে চলতি মাসের ১৮ তারিখ পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছে এবং ২৬ জন মারা গেছে।

ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঘটায় ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী এডিস মশার দুটি প্রজাতি। যার একটি হলো এডিস ইজিপ্টি, আরেকটি হলো অ্যালবোপিকটাস। এডিস ইজিপ্টিকে শহুরে মশা বা নগরের মশা অথবা গৃহপালিত মশা বলা হয়; আর অ্যালবোপিকটাসকে বলা হয় এশিয়ান টাইগার মশা অথবা গ্রামের মশা। এডিস মশা পাত্রে জমা পানিতে জন্মায় এবং বর্ষাকালে এর ঘনত্ব বেশি হয়। তাই ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব এ সময় বেড়ে যায়।

২০০৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম চিকুনগুনিয়া ধরা পড়ে। এরপর ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতি বছর চিকুনগুনিয়া রোগ শনাক্ত হয়। অ্যানোফিলিস মশার সাতটি প্রজাতি বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ায়। বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা ও বর্ডার এরিয়ার মোট ১৩ জেলার ৭২টি উপজেলায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ২০০৮ সালে ৮৪ হাজার ৬৯০ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং ১৫৪ জন মারা যায়।

মহামারি করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত সারা বিশ্ব। গত বছর করোনার প্রথম ঢেউয়ে বাংলাদেশে সংক্রমণ ও মৃত্যু কিছুটা কম ছিল। তবে এ বছর দ্বিতীয় ঢেউয়ে দৈনিক সংক্রমণ ও মৃত্যু রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সংক্রমণরোধে টানা কঠোর লকডাউন আরোপ করে সরকার।

দীর্ঘদিনের লকডাউনে সুফল হিসাবে আগের তুলনায় মহামারি করোনাভাইরাসে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমেছে। ফলে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে নগরবাসীর মনে। এর মধ্যেই ফের এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। গত সপ্তাহজুড়ে প্রতিদিন আড়াইশ থেকে তিনশ রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। ফলে করোনা ‘ভুলে’ এখন ডেঙ্গু আতংকে রাজধানীবাসী।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত সাত হাজার ২৫১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রাজধানীসহ সারাদেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আর চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৩১ জন। আক্রান্ত ও মৃতদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা বেশি।

জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৭২ জন। কিন্তু জুলাই থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পায়। জুলাইয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন দুই হাজার ২৮৬ জন। তাদের মধ্যে ১২ জনের মৃত্যু হয়।

চলতি আগস্ট মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা আরও বেড়েছে। মাসের প্রথম ১৯ দিনেই আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৫৯৩ জনে। আর মারা গেছেন ১৯ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সারাদেশের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা এখন এক হাজার ২৩৮ জন। তাদের মধ্যে এক হাজার ১৪৫ জন ঢাকার হাসপাতালে এবং ঢাকার বাইরে ৯৩ জন ভর্তি রয়েছেন।মশা দিবস ডেঙ্গু

এ বছরের মশা দিবসের প্রতিপাদ্য

ডেঙ্গু আতংকের মধ্যেই আজ শুক্রবার  ‘বিশ্ব মশা দিবস’ পালিত হচ্ছে। এ বছর মশা দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘ম্যালেরিয়াশূন্য লক্ষ্য অর্জন’।

১৯৩০ সাল থেকে প্রতিবছর ২০ আগস্ট দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ব্রিটিশ চিকিৎসক রোনাল্ড রস ১৮৯৭ সালের ২০ আগস্ট ম্যালেরিয়া রোগের কারণ ‘অ্যানিফিলিস প্রজাতির মশা’ আবিস্কার করায় এ দিনটি ‘বিশ্ব মশা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। স্বাধীনতার পর ৫০ বছর পার করেছে বাংলাদেশ। এ পাঁচ দশকে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় বসেছে। মশক নিধন ও নিয়ন্ত্রণে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু মশার দাপট সব সরকারের আমলেই অব্যাহত রয়েছে।

চলতি বছর বিশ্ব মশা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ম্যালেরিয়াশূন্য লক্ষ্য অর্জন’ থাকলেও বর্তমানে মহামারি করোনা পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে।

ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস মশার দুটি প্রজাতির মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়ায়। সেগুলো হলো, এডিস ইজিপ্টি ও অ্যালবোপিকটাস প্রজাতি। এডিস ইজিপ্টিকে শহুরে ও অ্যালবোপিকটাসকে গ্রামের মশা বলা হয়। এডিস মশা পাত্রে জমা পানিতে জন্ম নেয়। বর্ষাকালে এর ঘনত্ব বেশি হয়। তাই ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব এ সময়ে বেড়ে যায়।

বাংলাদেশে মশাবাহিত আরও যেসব ভাইরাস

চিকুনগুনিয়া
ডেঙ্গুর মতো চিকুনগুনিয়া রোগটিও এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। ১৯৫২-৫৩ সালে তানজানিয়ায় প্রথম চিকুনগুনিয়া শনাক্ত করা হয়। ২০০৫-২০০৬ সালে ভারতে ভাইরাসবাহিত এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম চিকুনগুনিয়া ধরা পড়ে। ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতিবছর চিকুনগুনিয়া রোগ শনাক্ত হয়। এ রোগে আক্রান্ত হলে হাড়সহ শরীরে ব্যথায় কাতর হয়ে পড়েন রোগী।

ম্যালেরিয়া
অ্যানোফিলিস মশার সাতটি প্রজাতির মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। এর মধ্যে চারটি প্রজাতিকে প্রধান বাহক বলা হয়। বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা ও সীমান্ত এলাকায় মোট ১৩ জেলার ৭২টি উপজেলায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ২০০০ সালের পর সবচেয়ে বেশি ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা যায় ২০০৮ সালে।

২০০৮ সালে ৮৪ হাজার ৬৯০ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং ১৫৪ জন মারা যায়। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এ সংখ্যা কিছুটা কমে আসে। ওই বছর আক্রান্ত হয় ১৭ হাজার ২২৫ জন। ম্যালেরিয়া বাহক অ্যানোফিলিস মশা গ্রীষ্ম-বর্ষায় বেশি জন্ম নেয় এবং রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ে।

ফাইলেরিয়া
ফাইলেরিয়া বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম-দক্ষিণের প্রায় ৩৪টি জেলায় কম-বেশি পাওয়া যায়। এ রোগে মানুষের হাত-পা ও অন্যান্য অঙ্গ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠে। স্থানীয়ভাবে এ রোগকে ‘গোদ রোগ’ বলা হয়ে থাকে। এক সময় এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি ছিল। তবে ফাইলেরিয়া এলিমিনেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে এটিকে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে। ফাইলেরিয়া নেমাটোড জাতীয় কৃমি, ইউচেরিয়া ব্যানক্রফটি বাহিত মশার দ্বারা সংক্রমিত হয়। কিউলেক্স মশার দুটি প্রজাতি ও ম্যানসোনিয়া মশার একটি প্রজাতির মাধ্যমে বাংলাদেশে এ রোগ ছডায়।

জাপানিজ এনকেফালাইটিস
এ রোগ বাংলাদেশে প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৭৭ সালে। মধুপুর বন এলাকায় এর বিস্তার দেখা যায়। এরপর বিভিন্ন সময়ে রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম, খুলনা অঞ্চলে এ রোগটি পাওয়া যায়। জাপানিজ এনকেফালাইটিস রোগটি কিউলেক্স মশার মাধ্যমে ছড়ায়।

Advertisement

আরও পড়ুন

Advertisementspot_img
Advertisement

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে পাশে থাকুন

Advertisement