২৪ জুলাই, ২০২৪, বুধবার

মারদেকা কাপে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ

Advertisement

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন ক্রীড়া প্রেমী মানুষ। দেশের অন্যসব উন্নয়নের পাশাপাশি ক্রীড়া ক্ষেত্রে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার চিন্তা চেতনা ছিলো চোখে পড়ার মত। দেশের খেলাধুলার খবর তিনি রাখতেন সবসময়ই। তাই জাতীয় দলগুলো যখন কোন টুর্নামেন্ট খেলতে দেশের বাইরে যেতেন তখন এক নজরের জন্য হলেও গণভবনে গিয়ে বাঙ্গালি জাতির পিতাকে দর্শন দিয়ে আসতেন।

১৯৭৫ সালের ২৭ জুলাই তাই করেছিলেন বাংলাদেশের ফুটবলের লিজেন্ডরা। মালয়েশিয়ার মারদেকা কাপ ফুটবলে অংশ নিতে যাওয়ার আগে গণভবনে গিয়েছিলেন বাঙ্গালির শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে। বর্তমানে ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন, আবাহনী ক্লাবের পরিচালক আশরাফ উদ্দিন চুন্নু সহ জাতীয় ফুটবল দলের অন্য সব ফুটবলাররা। বঙ্গবন্ধু তাদের শুভ কামনা জানিয়েছিলো। গণভবন থেকে বেরিয়ে সালাউদ্দিন-চুন্নুরা বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণা নিয়েই দেশে ছেড়েছিলো কিন্তু সেই দেখাই যে শেষ ছিলো তারা সেটা বুঝে উঠতে পারেনি। এরপর দল নিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়া টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া এসব নিয়েই ব্যতিব্যস্ত ছিলো বাংলাদেশ ফুটবল দল দল।

ঘটনাটি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে। ১৯৭৩ সালে এই মারদেকা কাপেই সালাউদ্দিনের সাথে পরিচয় হয়েছিলো এক শিখ ভদ্রলোকের। ১৯৭৫ এর আয়োজনেও তিনি ছিলেন মালয়েশিয়ায়। ঐ দিন অস্থির হয়ে খুঁজছিলেন কাজী সালাউদ্দিনকে। তখন চুন্নুর বয়স হবে ১৭ অথবা ১৮, বাংলাদেশ দলের অন্যতম সেরা ফুটবলার তিনি। সেই শিখ ভদ্রলোকের থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সপরিবারে নিহত হওয়ার কথা শুনে নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো বাংলাদেশের ফুটবল দল।

সেই ঘটনা চুন্নুর স্মৃতিতে এখনও পরিষ্কার, শিখ ভদ্রলোক বলছিলেন ‘তোমাদের প্রেসিডেন্ট খুন হয়েছে। তার পরিবারের সদস্যরাও আর বেঁচে নেই। সেই খবর শোনার সাথে সাথে কাজী সালাউদ্দিনের পরামর্শে সবাই ওই শিখ ভদ্রলোকের গাড়িতে করে দূতাবাসে যেয়ে দেখতে পান বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের মন প্রচণ্ড খারাপ। সালাউদ্দিন চুন্নুদের তিনি বলেন ‘বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের বার্তা পাওয়া গেছে। দেশে মিলিটারি ক্যু হয়েছে।’ তখন আর কারও মধ্যে অবিশ্বাস থাকেনি। তবে শেখ কামাল বেঁচে আছেন কিনা তা তখনও জানা যায়নি।

সেদিন বিকেলেই দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ ছিলো বাংলাদেশের কিন্তু তারা এই ম্যাচ খেলতে চাইছিলো না। কিন্তু ফিফার আয়োজিত ম্যাচ না খেললে সাসপেন্ড হওয়ার আশঙ্কা থাকে তাই খেলতে হয়েছিলো। তবে সেই ম্যাচেই এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছিলো বাংলাদেশের ফুটবল দল।

এই ঘটনা সম্পর্কে  চুন্নু বলেন, ‘আমরা কোনওভাবেই ম্যাচটি খেলতে চাইনি। দেশে এত বড় ঘটনা ঘটে গেছে। এরপর কীভাবে খেলি। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে খেলতে হয়েছে। তবে আমরা আয়োজকদের রাজি করিয়েছে কালো ব্যাজ পড়ে খেলবো। খেলার সময় মাঠের বাইরে আমাদের লাল-সবুজ পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। ওরাও সহমর্মিতা জানিয়ে আমাদের সব দাবি মেনে নিয়েছে। ম্যাচটি কোনোমতে খেলে চার গোলে হেরেছিলাম।’

ম্যাচ শেষ করে খেলোয়াড়রা জানতে পারেন, আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামালও নিহত হয়েছেন। জাতীয় দলের খেলা দেখতে বঙ্গবন্ধুর বড় পুত্রের মালয়েশিয়াতে আসার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আসার কথা থাকায় শেখ কামাল আসতে পারেননি। এখনও আফসোস হয় সেই দলের ফুটবলারদের ইস যদি শেখ কামাল আসতো আমাদের সাথে।

আশরাফ উদ্দিন চুন্নু দুঃখভারাক্রন্ত মনে বলছেন ‘শেখ কামাল ভাই আমাদের সঙ্গে মালয়েশিয়া আসতো তাহলে হয়তো তিনি বেঁচে থাকতেন। আসলে আমাদের দুর্ভাগ্য। আমরা তাকে অল্প বয়সে হারিয়েছি। আজ তিনি বেঁচে থাকলে আমাদের ক্রীড়াঙ্গন আরও এগিয়ে যেতো।

২৯ আগস্ট যখন দেশে ফেরে বাংলাদেম দল তখন বেশ জেরার মুখে পড়তে হয়েছিলো, ভয় ভীতি নিয়েই বিমান থেকে নামতে হয়েছিলো চুন্নু-সালাউদ্দিনদের। বিশেষ করে সেই দলে তাকা আবাহনীর ছয় ফুটবলারকে পড়তে হয়েছিলো জেররা মুখে। কাজী সালাউদ্দিনের চুল কেন বড়? এমন প্রশ্নের উত্তরও দিতে হয়েছে। এমনকি সেসময় লাগেও লাগেজও পাওয়া যায়নি।

সেসময় ঢাকা আবাহনী ক্লাবে কেও যাওয়ার সাহস পাচ্ছিলেন না। তবে ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লিগ শুরুর ঘোষণা দেওয়ায় সবাই একত্রিত হতে থাকেন। তখন ক্লাবে কেউ থাকতেন না। বিভিন্ন ক্লাবে থেকে অনুশীলন করেছেন। ওই মৌসুমে রুটি-কলা খেয়ে দলের জন্য খেলেছেন।

চুন্নু বলছেন, ‘মাঠের পাশে বটগাছের নিচে বসে অনুশীলনের পর রুটি-কলা খেয়ে কোনওমতো টিকে ছিলাম। তারপর যে যার ঠিকানায় ফিরে যেতাম। কেউবা অন্য ক্লাবে আর কেউবা নিজেদের বাসায়। সেই বছর অনেক কষ্টে লিগে খেলেছি। আমরা কোনওভাবেই শেখ কামালের হাতেগড়া আবাহনী ক্লাব শেষ হতে দেইনি।’

এভাবে লিগ শেষ করার পর ছিয়াত্তর সালে আবাহনী ক্লাব যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। কর্নেল কাজী শাহেদ আহমেদ হাল ধরেন ক্লাবের। তিনি সে সময় বলেছিলেন, ‘তোমরা নির্বিঘ্নে খেলো। কোনও সমস্যা নেই, আমি সব দেখছি।’

সেনাবাহিনীর একজন কর্নেলকে সামনে পেয়ে খেলোয়াড়দের ভয়ডর উড়ে যায় সেসময়। আশরাফ উদ্দিন চুন্নুর ভাষায় ‘১৯৭৬ সালে একজন রানিং কর্নেল আমাদের ক্লাবের পরিচালনায় আসায় আমরা যেন নতুন করে পথ চলায় উদ্দীপনা পাই। এরপর আমাদের আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তবে ৭৫ পরবর্তী ক্লাবের ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে তা কোনওভাবেই ভোলার নয়।’

Advertisement

আরও পড়ুন

Advertisementspot_img
Advertisement

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে পাশে থাকুন

Advertisement