২৫ জুন, ২০২৪, মঙ্গলবার

প্লাস্টিক বর্জ্যে হুমকির মুখে পরিবেশ

Advertisement

সারাদেশের উৎপাদন নির্ভর অঞ্চল সংলগ্ন নদনদী গুলো প্লাস্টিক বর্জ্যে সয়লাব। পলিথিন নিষিদ্ধ হওয়ার পর গত দুই দশকে শুধু রাজধানীতেই প্লাস্টিক বর্জ্য বেড়েছে ৩ গুণের বেশি। ২০০২ সালে আইনের মাধ্যমে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এমন বাস্তবতায় ওই আইন কার্যকরে এ বছরের জানুয়ারিতে ফের সেই আইনি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে এক বছরের সময় বেঁধে দিয়েছে উচ্চ আদালত। কিন্তু পলিথিনের বিকল্প তৈরিতে নেই কোনো উদ্যোগ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গলদ ও নগরবাসীর অসচেতনতায় ভয়ংকর পরিণতির পথে এগোচ্ছে প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ। চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে মানুষ।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে হাই কোর্টের একটা নির্দেশনা আমরা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিচ্ছি। পলিথিনের বিকল্প হিসেবে সোনালি ব্যাগ জনপ্রিয়তা পায়নি। পাট থেকে তৈরি পলিব্যাগও এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। এজন্য আমরা বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারছি না।’
প্রাণ ও প্রাণীকুলের উপর প্লাস্টিকের প্রভাবঃ প্লাস্টিক বর্জ্যের ওপর ২৪টি গবেষণা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এ বছরের মার্চে সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র কণা মাছসহ নানা প্রাণীর দেহে প্রবেশ করছে। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এগুলো ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
এ গবেষণায় অংশ নেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. গাউসিয়া ওয়াহিদুন্নেসা চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ওপেন সোর্স টেকনোলজি ব্যবহার করে দেখেছি ভয়াবহ পরিণতির দিকে যাচ্ছি আমরা। প্লাস্টিক বোতল নদীতে ফেলে দেখা গেছে তিন মাসে একটা বোতল ৩ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। এখানে তো আমরা একটা বোতল ট্র্যাক করেছি। অথচ সাগর, নদী, জলাশয়ে হাজার হাজার প্লাস্টিক বোতল ফেলা হচ্ছে। এভাবে প্লাস্টিক বোতল ছড়াতে থাকলে আমরা ধারণা করতে পারি ২০৫০ সালে জলাশয়ে মাছের চেয়ে প্লাস্টিক বোতল বেশি থাকবে।’
পলিথিনে নগরগুলোর অবস্থাঃ ময়লার স্তূপে উড়ছে বিভিন্ন রঙের পলিথিন। শুধু পলিথিন নয় চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে প্লাস্টিকের নানারকমের বোতল, ব্যাগ। বেড়িবাঁধসংলগ্ন কামরাঙ্গীর চর, মিরপুরের রূপনগর খালে সবজায়গায় বদ্ধ পানিতে ভাসছে পলিথিন ও প্লাস্টিক বোতল ।শুধু তাই নয়, পানি নিষ্কাশনে রাজধানীজুড়ে শিরা-উপশিরার মতো ছড়িয়ে থাকা ড্রেনগুলো বন্ধ হয়ে গেছে পলিথিনে।
এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক এয়ার কমোডর মো. বদরুল আমিন বলেন, ‘রাজধানীর খাল-নর্দমা পরিষ্কার করে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় প্লাস্টিকের বোতল। কোমল পানীয়র বোতল থেকে শুরু করে এমন কিছু নেই যে আমরা বের করিনি। আর এ কারণেই বর্ষা এলেই রাজধানীজুড়ে জলজট তৈরি হয়।’
নগরবিদদের মতে সরকারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গলদে ঠেকানো যাচ্ছে না প্লাস্টিকের দূষণ। উন্নত বিশ্বের মতো নেই পচনশীল-অপচনশীল দ্রব্য আলাদাকরণের ব্যবস্থা। এর সঙ্গে যোগ হওয়া নাগরিক অসচেতনতা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।নাগরিকরা যার যেখানে ইচ্ছা সেখানেই ময়লা ফেলেন। ডাস্টবিনের চেয়ে বরং ঝিলের পাড়ে ও পানিতে বেশি ময়লা দেখা যায়।
পরিবেশ অধিদফতরসূত্রে জানা যায়, ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৮৯৭টি অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে ৫ হাজার ৯৫৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২০ কোটি ৮১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। পলিথিন ব্যবহারের কারণে ৯১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে।
পলিথিন এর বিকল্পঃ পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করলেও নেই কোনো বিকল্প পণ্য। পাটের ব্যাগকে জনপ্রিয় করতে পারেনি সরকার। প্লাস্টিক বর্জ্যের দূষণ ঠেকাতে পলিথিনের বিকল্প ব্যবহার এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের রিসাইক্লিং করাটা অপরিহার্য মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাট থেকে পলিব্যাগ, ফেলে দেওয়া বোতল থেকে ফ্লেক্স কিংবা পলিব্যাগ পুড়িয়ে জ্বালানি তেল উদ্ভাবনের মতো বিষেয়গুলোকে খুব একটা আমলে নেয়নি সরকার। এমনকি এ নিয়ে বড় পরিসরে গবেষণারও উদ্যোগ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘যেহেতু বাংলাদেশে পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্যের প্রচুর চাহিদা তাই এটা বন্ধ করা যাবে না। বরং এর রিসাইক্লিং কিংবা বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে। তাতে এ খাতে ব্যাপক কর্মস্থানেরও সুযোগ তৈরি হবে।’
আমাদের কাছে আতঙ্কের নাম এখন পলিথিন। যেহেতু এটা কখনো মাটিতে মেশে না, পচেও না তাই মাটির গুণ নষ্ট করে ফসলের ক্ষতি করে।আগে আমাদের দেশের নদীতে প্রচুর মাছ ছিল। কিন্তু এখন জালে মাছের বদলে উঠে আসে নানা রকমের বর্জ্য। বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করতো।সুপেয় পানি আর মাছে ভরা বুড়িগঙ্গার তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে পলিথিন। তাই পাট জাত পণ্যের দিকে আগ্রহ তৈরি করার দিকে পুনরায় মনোযোগ দিতে হবে ‍সরকার কে। এখনই দ্রুত এবং সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা না নিলে আমাদের দেশ পরিবেশ প্রকৃত সংরক্ষণে ব্যার্থ হবে । যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ফেলে দেবে চরম হুমকির মুখে ।

Advertisement

আরও পড়ুন

Advertisementspot_img
Advertisement

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে পাশে থাকুন

Advertisement