৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, মঙ্গলবার

মন্দার কারণে ব্যাংকের ঋণ আদায় কমেছে

Advertisement

বিশ্ববাজারে অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের আর্থিক খাতও ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার দিক থেকেই এ ঝুঁকির মাত্রা বেড়েছে। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সে হারে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বাড়েনি। ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়েছে। এ কারণে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটও দেখা দিয়েছে। ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনতে গিয়ে তারল্য ঘাটতিতে পড়েছে। মন্দার কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় কমেছে। উদ্যোক্তাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও কমেছে। ফলে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকিং খেলাপি ঋণ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এবার মন্দ ঋণ বা আদায় অযোগ্য ঋণ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল।

রোববার প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়ন প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতি তিন মাস পরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এবার সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক কারণে বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা হুমকিতে পড়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা রয়েছে। এর দ্বারা বাংলাদেশও আক্রান্ত হয়েছে। এ দেশের আর্থিক খাতেও অস্থিরতা ভর করেছে। আর্থিক খাতের কিছু সূচকে ভঙ্গুরতা দেখা দিয়েছে। এছাড়া চলতি হিসাবে ঘাটতি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিম্নমুখী। ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার কমছে। এতে মূল্যস্ফীতিতে চাপ বেড়েছে।

প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণও বেড়েছে। খেলাপি বাড়ায় ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের হার বেড়েছে। ঋণের মান কমেছে। এতে প্রভিশন সংরক্ষণের চাহিদা বেড়েছে। আর্থিক খাতে বিভিন্ন ধরনের আঘাতের মাত্রাও বেড়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, খেলাপি ঋণ ৩ শতাংশ বাড়লে ৬টি ব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন রাখতে পারবে না। শীর্ষ তিন ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে ১৬টি ব্যাংক চাহিদা অনুযায়ী মূলধন রাখতে পারবে না। জামানত ১০ শতাংশ কমলে ব্যাংকগুলোর বিপদ বাড়বে। মোট খেলাপি ঋণের ৪৯ শতাংশ রয়েছে ৫ ব্যাংকে। বাকি ৫১ শতাংশ অন্যান্য ব্যাংকে। ১০ ব্যাংকে রয়েছে খেলাপির ৬৫ শতাংশ। বাকি ৩৫ শতাংশ অন্যান্য ব্যাংকে।

মোট সম্পদের ৩১ শতাংশ ৫ ব্যাংকে। অন্যান্য ব্যাংকে ৬৯ শতাংশ। ১০ ব্যাংকে রয়েছে ৪৫ শতাংশ খেলাপি ঋণ ও অন্যান্য ব্যাংকে ৫৫ শতাংশ।

খেলাপি ঋণ গত বছরের সেপ্টেম্বরে ছিল ৮.১২ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৯.৩৬ শতাংশ। জুনের পর সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করে। এরপর থেকে প্রতি প্রান্তিকেই এর পরিমাণ লাখ কোটি টাকার উপরে রয়েছে। সেপ্টেম্বরে তা ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ২০ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে ৯টি ব্যাংকে। সেপ্টেম্বরে ছিল ৭টি ব্যাংকে। এখন ২টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়ে ২০ শতাংশ হয়েছে। মাত্র ১১টি ব্যাংকে ৩ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ রয়েছে। বাকি ৪৯টি ব্যাংকে ৩ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ২ থেকে ৩ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ থাকলেই ওই ব্যাংকে ঝুঁকিতে ফেলা হয়। ব্যাংকগুলোতে প্রভিশন বাবদ ৭৫ হাজার কোটি টাকা আটকে রয়েছে। প্রভিশন রাখা দরকার ৮৯ হাজার কোটি টাকা। প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণের মধ্যে মন্দ ঋণই ৮৮ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ এসব ঋণ ২ বছরের বেশি সময় ধরে খেলাপি। ৬ মাস ধরে খেলাপি ৮ শতাংশ এবং এক বছর ধরে খেলাপি ৪ শতাংশ। মন্দ ঋণও লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। এসব ঋণ একেবারে আদায় অযোগ্য বলে ধরা হয়। জুনে ছিল ১ লাখ ১২২ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে মন্দ ঋণ ছিল ৮৮.৮ শতাংশ। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯.৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে ছিল ৮৯ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা।

এদিকে নন ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমানত ও মূলধন কমেছে। বেড়েছে খেলাপি ঋণ। সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৭.৬২ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪.৬১ শতাংশ। গড়ে তাদের সম্পদ ও মূলধন থেকে আয় নেতিবাচক। গত বছরের মার্চে দুই খাতেই আয় নেতিবাচক পর্যায়ে রয়েছে। তবে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভালো করছে। গত এক বছরের ব্যবধানে ঋণ ঝুঁকি বেড়েছে। তবে মার্কেট ও পরিচালন ঝুঁকি সামান্য কমেছে।

Advertisement

আরও পড়ুন

Advertisementspot_img
Advertisement

ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে পাশে থাকুন

Advertisement